২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সাবধান! আপনার ফসলের মাঠ কি সাদা হয়ে যাচ্ছে? জেনে নিন এই মরণব্যাধি ছত্রাক দমনের সঠিক পদ্ধতি

 

মাঠের ফসলি জমিতে যখন এই **পাউডারি মিলডিউ (Powdery Mildew)** আক্রমণ করে, তখন এটি দ্রুত মহামারী আকার ধারণ করতে পারে। যেহেতু এটি কৃষকের খোলা মাঠের ফসল, তাই ঘরোয়া পদ্ধতির চেয়ে **পেশাদার কার্যকর কৃষি ব্যবস্থা** গ্রহণ করা জরুরি।

 নিচে কৃষকদের জন্য মাঠ পর্যায়ে এই রোগ দমনের পূর্ণাঙ্গ গাইড দেওয়া হলো:

 ## 🌾 মাঠের ফসলে পাউডারি মিলডিউ দমনের পেশাদার নির্দেশিকা

 মাঠের জমিতে এই সাদা পাউডারের মতো ছত্রাক মূলত বাতাসের মাধ্যমে এক গাছ থেকে অন্য গাছে ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ফলন ৫০-৬০% পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

 ### . কার্যকর ছত্রাকনাশক প্রয়োগ (Chemical Control)

 মাঠের ব্যাপক সংক্রমণের জন্য নিচের যেকোনো একটি ছত্রাকনাশক সঠিক নিয়মে স্প্রে করুন:

 * **সালফার ঘটিত ছত্রাকনাশক (যেমনআস্থা সালফা কিওর প্রতি লিটার জলে ২ মিলি-লিটার বা থিওভিট বা সুলফেক্স ৮০ ডব্লিউজি প্রতি লিটার জলে গ্রাম) মিশিয়ে স্প্রে করুন। এটি এই রোগের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং কার্যকর।

* **প্রোপিকোনাজোল (যেমন: টিল্ট ২৫০ ইসি):** প্রতি লিটার জলে . মিলি বা প্রতি ১০ লিটার জলে মিলি মিশিয়ে স্প্রে করুন। এটি ছত্রাককে ভেতর থেকে ধ্বংস করে।

* **কার্বেন্ডাজিম (যেমন: ব্যাভিস্টিন বা নোইন):** প্রতি লিটার জলে গ্রাম মিশিয়ে ১০-১২ দিন অন্তর দুইবার স্প্রে করুন।

 ### . প্রয়োগের সঠিক নিয়ম

 * **পাতার উল্টো পিঠ:** স্প্রে করার সময় লক্ষ্য রাখবেন যেন পাতার ওপরের সাথে সাথে নিচের পিঠও ভালোভাবে ভিজে যায়।

* **সঠিক সময়:** কড়া রোদে ছত্রাকনাশক স্প্রে করবেন না। পড়ন্ত বিকেলে বা খুব ভোরে স্প্রে করা সবচেয়ে ভালো।

* **আঠালো মিশ্রণ:** স্প্রে করার সময় ছত্রাকনাশকের সাথে সামান্য 'স্টিকার' (আস্থা স্টিকি) মিশিয়ে দিলে ওষুধটি পাতার গায়ে দীর্ঘক্ষণ লেগে থাকে।

 ### . কৃষি ব্যবস্থাপনা সতর্কতা (Cultural Practices)

 * **আক্রান্ত অংশ অপসারণ:** মাঠের যেসব গাছে আক্রমণ খুব বেশি, সেগুলো তুলে পুড়িয়ে ফেলুন। আক্রান্ত ডালপালা বা পাতা মাঠের আইলে ফেলে রাখবেন না।

* **সেচ নিয়ন্ত্রণ:** খুব ভোরে সেচ দিন যাতে সারাদিনের রোদে গাছের পাতা শুকিয়ে যায়। রাতে পাতার ওপর জল জমে থাকলে এই ছত্রাক দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

* **পরিমিত সার:** জমিতে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন (ইউরিয়া) সার ব্যবহার বন্ধ করুন। ইউরিয়া সার গাছকে নরম করে তোলে, ফলে ছত্রাক দ্রুত আক্রমণ করতে পারে। পটাশ সারের পরিমাণ কিছুটা বাড়ালে গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

* **বাতাস চলাচল:** লতানো জাতীয় ফসল (যেমন লাউ, কুমড়া বা উচ্ছে) হলে মাচা পরিষ্কার রাখুন এবং অতিরিক্ত পুরনো পাতা কেটে দিন যাতে নিচ দিয়ে বাতাস চলাচল করতে পারে।

### . আগাম সতর্কতা

 পরবর্তী মৌসুমে একই জমিতে এই রোগ এড়াতে:

 * **বীজ শোধন:** বপনের আগে বীজ অবশ্যই ছত্রাকনাশক দিয়ে শোধন করে নিন।

* **ফসল পর্যায়:** একই জমিতে বারবার একই জাতীয় ফসল (যেমন পরপর দুইবার কুমড়া জাতীয় ফসল) চাষ করবেন না।

২৮ নভেম্বর ২০২৫

পশ্চিমবঙ্গে সরিষা চাষের সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

কৃষক বন্ধুদের জন্য পশ্চিমবঙ্গে সরিষা চাষের (Mustard Cultivation) একটি সম্পূর্ণ নির্দেশিকা নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো। এটি সহজ ও সঠিক তথ্য দিয়ে তৈরি, যাতে আপনারা সর্বোচ্চ উৎপাদন পেতে পারেন।

🌾 পশ্চিমবঙ্গে সরিষা চাষের সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

সরিষা (তোষা বা রাই) পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান তেলবীজ ফসল। সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করলে ভালো ফলন নিশ্চিত।

১. উপযুক্ত সময় (কখন চাষ করবেন?)

বিষয়সঠিক সময়বিস্তারিত
সময়কালমধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বরসরিষা মূলত রবি শস্য। পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়ায় বীজ বোনার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো কার্তিক মাসের মাঝামাঝি থেকে অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
আদর্শ তাপমাত্রা15 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড - 25 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডবীজ অঙ্কুরোদ্গমের জন্য 20 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড -30 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা এবং বৃদ্ধির জন্য 15-20 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড আদর্শ।

২. মাটি প্রস্তুতি (কেমনভাবে ও কী ব্যবহার করে?)

সরিষা চাষের জন্য জল নিকাশির ব্যবস্থা যুক্ত দোআঁশ বা বেলে-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযুক্ত।

ধাপকরণীয়প্রয়োজনীয় উপকরণ
চাষ2 থেকে 3 বার গভীর চাষ দিন এবং মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে ও সমান করে নিন। জমিতে যেন কোনো বড় ঢ্যালা না থাকে।ট্রাক্টর বা লাঙ্গল, মই
সার প্রয়োগ (জমির শেষ চাষের সময়)জৈব সাররাসায়নিক সার প্রয়োগ করে মাটির উর্বরতা বাড়াতে হবে।
জৈব সারশেষ চাষের আগে একর প্রতি 5-7 টন গোবর সার বা 3-4 টন ভার্মিকম্পোস্ট মিশিয়ে দিন।গোবর সার/ভার্মিকম্পোস্ট
রাসায়নিক সার (প্রতি একর)ইউরিয়া (Urea): 35-40 kg.ইউরিয়া, ডিএপি, পটাশ
ডিএপি (DAP): 40-50 kg.
পটাশ (MoP): 20 kg.
অতিরিক্ত পুষ্টিসরিষার জন্য গন্ধক (Sulphur) অত্যন্ত জরুরি। শেষ চাষের সময়  10 kg গন্ধক (সালফার) প্রয়োগ করলে তেলের পরিমাণ বাড়ে।গন্ধক বা জিপসাম

৩. বীজ বপন পদ্ধতি

ধাপপদ্ধতিবিস্তারিত
বীজের হারপ্রতি একর জমিতে 2.5 - 3 কেজি উন্নত মানের বীজ।
বীজ শোধনবীজ বোনার আগে কার্বেন্ডাজিম (Carbendazim) বা থাইরাম (Thiram) জাতীয় ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করুন।ছত্রাকনাশক (যেমন: 2g/kg বীজ)
বপন পদ্ধতিসারিতে বপন করাই সবচেয়ে ভালো।
দূরত্বসারির দূরত্ব: 30 cm (1 feet)
গাছের দূরত্ব: 10-15 cm (চারা তুলে পাতলা করার পর)
বপনের গভীরতা3-4 cm গভীরতায় বীজ বুনুন।

৪. জলসেচ ও সারের টপ ড্রেসিং

সরিষা চাষে মাত্র দু'টি পর্যায়ে জলসেচ দেওয়া সবচেয়ে জরুরি।

সময়কখন সেচ দেবেন?টপ ড্রেসিং (সার)পদ্ধতি ও সাবধানতা
প্রথম সেচবীজ বোনার 20-25 দিন  পর (গাছের 4-6 পাতা পর্যায়)।প্রথম টপ ড্রেসিং: ইউরিয়ার বাকি অর্ধেক (আনুমানিক 18-20 kg ইউরিয়া) এই সেচের আগে জমিতে ছড়িয়ে দিন।হালকা সেচ দিন। খেয়াল রাখবেন, জমিতে যেন জল জমে না যায়।
দ্বিতীয় সেচফুল আসার সময় (বীজ বোনার 40-45 দিন পর)।প্রয়োজন নেই (মাটি খুব দুর্বল হলে সামান্য ইউরিয়া দেওয়া যেতে পারে)।এই সেচ ফসলের দানা ভরাটে সাহায্য করে। জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা নিশ্চিত করুন।

৫. সরিষা চাষের প্রধান সমস্যা ও সমাধান

সমস্যালক্ষণব্যবস্থাপনা ও প্রতিকার
জাব পোকা (Aphid)কচি ডগা ও ফুলের থোকায় অসংখ্য ছোট পোকা ভিড় করে রস চুষে নেয়।প্রথম দেখা দিলেই: ইমিডাক্লোপ্রিড (Imidacloprid) বা ডাইমেথোয়েট (Dimethoate) জাতীয় কীটনাশক স্প্রে করুন।
সাদা মরচে (White Rust)পাতার নিচের দিকে সাদাটে ফোস্কা ও গুঁড়ো দেখা যায়।ম্যানকোজেব (Mancozeb) বা মেটাল্যাক্সিল (Metalaxyl) জাতীয় ছত্রাকনাশক নির্দেশিত মাত্রায় স্প্রে করুন।
শুঁটি পচা রোগশুঁটিতে কালো ছোপ দেখা যায় এবং শুকিয়ে যায়।আগাম ছত্রাকনাশক স্প্রে করা এবং রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার করা।
আগাছাআগাছা পুষ্টি ও আলোর জন্য ফসলের সাথে প্রতিযোগিতা করে।প্রথম সেচের আগে হাতে নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করুন। বা বীজ বোনার 2-3 দিনের মধ্যে উপযুক্ত আগাছানাশক ব্যবহার করুন।

৬. ভালো উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা

  • চারা পাতলাকরণ (Thinning): বীজ বোনার 10-15 দিন পর প্রতি সারিতে অতিরিক্ত চারা তুলে 10-15 cm  দূরত্ব বজায় রাখুন। এতে প্রতিটি গাছ পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পাবে।

  • বোরন প্রয়োগ: ফুল আসার আগে 0.2%  বোরন (প্রতি10  লিটার জলে 20g বোরন) স্প্রে করলে পরাগসংযোগ ভালো হয় এবং ফলন বাড়ে।

  • ফসল আবর্তন: একই জমিতে প্রতি বছর সরিষা চাষ না করে অন্য ফসল (যেমন: ধান) চাষ করলে মাটির উর্বরতা বজায় থাকে।

৭. ফসল কাটা ও সংরক্ষণ

ধাপসময়কালপদ্ধতি ও সাবধানতা
ফসল তোলার সময়বীজ বোনার 90-120 দিন পর (জাত ভেদে)।যখন  75-80% শুঁটি হলুদ হয়ে যায় এবং 65-70% দানা শক্ত হয়, তখনই ফসল কাটার উপযুক্ত সময়।
কাটার পদ্ধতিসকালে বা শেষ বিকেলে ফসল কাটুন। কাটার পর ছোট ছোট আঁটি বেঁধে $\text{4-5 দিন}$ মাঠে শুকিয়ে নিন।
ঝাড়াই ও সংরক্ষণভালোভাবে ঝাড়াই করে দানা বের করুন।
সংরক্ষণদানা ভালোভাবে শুকিয়ে 8% এর নিচে আর্দ্রতা থাকলে তবেই সংরক্ষণ করুন। বায়ুরোধী পাত্রে ঠাণ্ডা ও শুকনো জায়গায় সরিষার দানা সংরক্ষণ করুন।