নারিকেল গাছে ফল পচা ও বাটন শেডিং রোগ (Fruit Rot / Button Shedding Disease) বেশ প্রচলিত একটি রোগ, যা গাছের ফলন হ্রাস করে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনে। এটি মূলত ছত্রাকজনিত সংক্রমণ ও কিছু পরিবেশগত কারণ দ্বারা হয়ে থাকে।
📌 কেন হয়? (কারণ)
✅ ছত্রাক সংক্রমণ:
- প্রধানত Phytophthora palmivora, Colletotrichum gloeosporioides, এবং Fusarium sp.
ছত্রাকের সংক্রমণের কারণে এই রোগ হয়।
- ছত্রাক গাছের কচি ফলের সংস্পর্শে এলে তা পচে যায় এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
✅ আবহাওয়া ও
পরিবেশগত কারণ:
- অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং বৃষ্টিপাত হলে ছত্রাক দ্রুত ছড়ায়।
- টানা বৃষ্টি বা দীর্ঘ সময় গাছ ভেজা থাকলে ফল সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
- বাতাসের উচ্চ আর্দ্রতা (৮০%+ RH) এবং ২৫-৩০°C তাপমাত্রা ছত্রাকের বৃদ্ধিতে সহায়ক।
✅ পুষ্টির অভাব:
- বোরন, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি থাকলে গাছের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
✅ পোকামাকড়ের সংক্রমণ:
- নারিকেল ফসলের কিছু কীটপতঙ্গ (যেমন রেড পাম উইভিল, স্কেল ইনসেক্ট) গাছের ফুল ও কচি ফলে আক্রমণ করলে সেখানে ছত্রাক সহজেই প্রবেশ করতে পারে।
📌 হলে গাছের কি সমস্যা হয়? (লক্ষণ)
✅ ফুল ও
কচি ফল ঝরে পড়া:
- পরাগায়নের পর কচি ফল (Button) স্বাভাবিকভাবে বড় না হয়ে ধীরে ধীরে বাদামি বা কালো হয়ে ঝরে পড়ে।
✅ ফলের গায়ে
বাদামি দাগ:
- কিছু ফল কচি অবস্থাতেই পচে যায় এবং দাগযুক্ত হয়ে পড়ে।
- দাগের চারপাশে ছত্রাকের উপস্থিতির কারণে সাদা বা ধূসর ছত্রাক আবরণ দেখা যায়।
✅ ফলের ভেতরে
নরম ও পচন:
- আক্রান্ত নারিকেলের ভেতরের অংশ নরম হয়ে গন্ধযুক্ত পচা তরল বের হতে পারে।
✅ গাছের দুর্বলতা:
- দীর্ঘমেয়াদে এই রোগ হলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফলন কমে যায়।
📌 আটকানোর উপায় (প্রতিরোধ ব্যবস্থা)
✅ সঠিক নিষ্কাশন
ব্যবস্থা:
- বাগানের পানি জমতে দেবেন না এবং গাছের গোড়া শুকনো রাখুন।
- বেশি বৃষ্টির সময় নারিকেল গাছের চারপাশে খাল কেটে নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন।
✅ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা:
- আক্রান্ত ফল দ্রুত সংগ্রহ করে ধ্বংস করুন এবং পচা ফল মাটিতে পড়ে থাকলে তা তুলে ফেলুন।
- গাছের গোড়ায় পুরনো শুকনো পাতা বা আবর্জনা জমতে দেবেন না।
✅ জৈব ছত্রাকনাশক
প্রয়োগ:
- Trichoderma
harzianum ও Pseudomonas
fluorescens ব্যবহার
করলে মাটির ক্ষতিকর ছত্রাক প্রতিরোধ করা যায়।
- প্রতি ১৫ দিন অন্তর ২% বোর্দো মিশ্রণ (Bordeaux
Mixture) স্প্রে করলে রোগের প্রকোপ কমে।
✅ পুষ্টি সরবরাহ
নিশ্চিত করা:
- গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বোরন (B), ম্যাগনেসিয়াম (Mg), এবং ক্যালসিয়াম (Ca) সমৃদ্ধ সার প্রয়োগ করুন।
- নারিকেলের ভালো বৃদ্ধির জন্য প্রতি গাছে বছরে ২-৩ বার ভার্মিকম্পোস্ট, জৈব সার ও ট্রাইকোডার্মা সমৃদ্ধ সার ব্যবহার করুন।
✅ পোকামাকড় দমন
করুন:
- রেড পাম উইভিল, স্কেল ইনসেক্ট বা অন্যান্য ক্ষতিকারক পোকামাকড় প্রতিরোধ করতে ফেরোমোন ট্র্যাপ ব্যবহার করুন।
- নিমতেল বা বায়োপেস্টিসাইড প্রয়োগ করলে পোকামাকড়ের আক্রমণ কমে।
📌 আক্রান্ত হলে করণীয় (প্রতিকার ব্যবস্থা)
✅ সংক্রমিত ফল
অপসারণ করুন:
- আক্রান্ত ফল ও ফুল সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলুন বা মাটিতে পুঁতে দিন, যাতে ছত্রাক ছড়াতে না পারে।
✅ ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করুন:
- প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম কপার অক্সিক্লোরাইড মিশিয়ে স্প্রে করুন।
- ০.৩% মেটাল্যাক্সিল + ম্যানকোজেব
(Metalaxyl + Mancozeb) প্রয়োগ
করলে ছত্রাক সংক্রমণ কমবে।
- প্রতি ১০-১৫ দিন অন্তর কার্বেন্ডাজিম
(Carbendazim) বা
ক্যাপ্টান
(Captan) ছত্রাকনাশক
স্প্রে
করুন।
✅ বায়োলজিক্যাল কন্ট্রোল ব্যবহার
করুন:
- Trichoderma
viride বা Pseudomonas
fluorescens ব্যবহার
করলে মাটির ক্ষতিকারক ছত্রাক ধ্বংস হয় এবং গাছের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
✅ গাছের গোড়ায়
জৈব সার প্রয়োগ করুন:
- ভার্মিকম্পোস্ট, নিম খোল এবং ট্রাইকোডার্মা সমৃদ্ধ জৈব সার প্রয়োগ করলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
✅ নিয়মিত পরিদর্শন
করুন:
- নারিকেল গাছের ফুল ও কচি ফল নিয়মিত পরীক্ষা করুন, যাতে সংক্রমণের কোনো লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
নারিকেলের
ফল পচা ছত্রাক রোগ
(Fruit Rot / Button Shedding Disease) প্রধানত
ছত্রাক সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে, যা
গাছের ফলন কমিয়ে দেয়
এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়। প্রতিরোধের
জন্য পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, সঠিক
পুষ্টি সরবরাহ করা, এবং জৈব
ও রাসায়নিক ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করা জরুরি। আক্রান্ত
হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ
করতে হবে, যাতে গাছ
সুস্থ থাকে এবং ভালো
ফলন দেয়।